বুধবার, ১৭ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২রা পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২৬শে জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

বুধবার১৭ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ২রা পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ২৬শে জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

ধর্ষণের শাস্তি নিয়ে ইসলামে যা বলা হয়েছে

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৫ | ১১:৫২ পূর্বাহ্ণ

ধর্ষণের শাস্তি নিয়ে ইসলামে যা বলা হয়েছে

ইসলামি শরিয়তে শিরক ও হত্যার পর ব্যভিচার বা ধর্ষণ সুস্পষ্ট হারাম ও বড় ধরনের অপরাধ হিসাবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। ইসলামে ব্যভিচারী এবং ধর্ষণকারীকে জনসম্মুখে শাস্তি প্রদানের বিধানের বর্ণনা রয়েছে।

ইসলামে ব্যভিচারের চেয়েও ধর্ষণের শাস্তি আরও কঠোর করে বর্ণনা করা হয়েছে। ব্যভিচারের ক্ষেত্রে দুজনেই সমানভাবে দোষী থাকে। আর ধর্ষণের ক্ষেত্রে একপক্ষের পাশবিক হিংস্রতার শিকার হয় অন্যপক্ষ। একপক্ষ হয় অত্যাচারী অপরপক্ষ হয় অত্যাচারিত।

যদি বিবাহিত কেউ ব্যভিচার করে তাহলে তার শাস্তি হলো প্রকাশ্যে পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া। আর যদি ব্যভিচারী অবিবাহিত হয় তাহলে তাকে প্রকাশ্যে একশটি বেত্রাঘাত করা হবে

ধর্ষণের সংজ্ঞা

ধর্ষণের আরবি প্রতিশব্দ ‘ইগতিসাব’। অর্থ ছিনিয়ে নেওয়া। পরিভাষায় ধর্ষণ বলা হয়, অনিচ্ছায়, জোরপূর্বক ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে যৌন চাহিদা পূরণ করা।ধর্ষকের জুলুমের মাত্রা অনুসারে ধর্ষণকে নানাভাবে চিহ্নিত করা যায়।।

কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আর ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।’ (সূরা বনি ইসরাইল-৩২)।

আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী তাদের প্রত্যেককে একশটি করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকরীকরণে ওদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের অভিভূত না করে; যদি তোমরা আল্লাহতে এবং পরকালে বিশ্বাসী হও। আর মুমিনদের একটি দল যেন ওদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। (সূরা আর নূর-০২)।

নবীজির হুঁশিয়ারি

হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, অবিবাহিত পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে শাস্তি একশ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য দেশান্তর। আর বিবাহিত পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে একশ বেত্রাঘাত ও রজম তথা পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড। (সহিহ মুসলিম)।

হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এক মহিলাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হলে নবিজি (সা.) মহিলাকে কোনোরূপ শাস্তি দেননি, তবে ধর্ষককে ওদের শাস্তি দেন।’ (ইবনে মাজাহ ২৫৯৮)।

হজরত সাঈদ ইবনে জায়েদ (রা.) বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছি, ‘সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে যে ব্যক্তি নিহত হয়েছে, সে শহিদ। জীবন রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে, সে শহিদ। দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে, সেও শহিদ। আর সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে যে নিহত হয়েছে, সেও শহিদ।’ (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

ওই হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, যদি কেউ নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে মারা যায় তাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) শহিদ বলে অবিহিত করেছেন।

ইসলামী আইনে ধর্ষকের শাস্তি

ইসলামী আইনে ধর্ষণ একটি বহু মাত্রিক অপরাধ। যার মধ্যে কমপক্ষে তিনটি অপরাধ সংঘটিত হয়। তাহলো : ক. ব্যভিচার, খ. বল প্রয়োগ ও ভীতি প্রদর্শন, গ. সম্ভ্রম লুণ্ঠন।

ইসলামী আইনে এই তিনটি বিষয়ই পৃথকভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর ধর্ষণে যেহেতু এই তিনটি অপরাধের সমন্বয় ঘটে, তাই ধর্ষণ একটি গুরুতর অপরাধ।

ইসলামী আইনে ধর্ষকের শাস্তি কী হবে তা নির্ভর করে তার অপরাধের মাত্রা ও স্তরের ওপর। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো—

১. ব্যভিচারের শাস্তি : বেশির ভাগ আলেম বলেন, ধর্ষক যদি প্রাণঘাতী অস্ত্রের মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শন না করে শুধু বল প্রয়োগ করে, তবে সে ব্যভিচারের শাস্তি ভোগ করবে। ইসলামী আইনে ব্যচিভারের শাস্তি হলো—

ক. ব্যভিচারে লিপ্ত ব্যক্তি অবিবাহিত হলে এক শ কশাঘাত।

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী—তাদের প্রত্যেককে এক শ কশাঘাত করবে। আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের প্রভাবিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও; মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ২)

খ. ব্যভিচারে লিপ্ত ব্যক্তি বিবাহিত হলে তার শাস্তি প্রস্তারাঘাতে মৃত্যু। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন বিবাহিত নারী ও পুরুষ ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তখন তাদের মৃত্যু (নিশ্চিত হওয়া) পর্যন্ত পাথর নিক্ষেপ করো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৫৫৩)

২. মুহারিবের শাস্তি: ধর্ষক যদি অস্ত্রধারণ করে অথবা অন্য কোনো উপায়ে ধর্ষিতাকে জীবনের হুমকি দেয়, তবে তার ওপর মুহারিবের শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। মুহারিব হলো, যে ব্যক্তি ত্রাস সৃষ্টি করে কোনো কিছু কেড়ে নেয়। চাই ত্রাস সৃষ্টিকারী অস্ত্র ব্যবহার করুক বা না করুক।

মুহারিবের শাস্তি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি হচ্ছে—তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে বা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে কিংবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এটি তাদের পার্থিব লাঞ্ছনা, আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩৩)

৩. উঁচু স্থান থেকে ফেলে হত্যা: ধর্ষক যদি বলাৎকার করে, তখনো তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এই শাস্তি কিভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে তা নিয়ে ফিকহের ইমামদের মতভিন্নতা আছে।

তা হল : ক. তাকে প্রস্তারাঘাতে হত্যা করা হবে, খ. তাকে পুড়িয়ে হত্যা করা হবে, গ. তাকে উঁচু স্থান থেকে ফেলে দেওয়া হবে এবং ওপর থেকে তার ওপর পাথর নিক্ষেপ করা হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-সহ একদল সাহাবি শেষোক্ত পদ্ধতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। (আস সিয়াসাতুশ শরইয়্যা, পৃষ্ঠা-১৩৮)

৪. মৃত্যুদণ্ড : ধর্ষক যদি কোনো শিশুকে ধর্ষণ করে এবং এতে তার মৃত্যু হয়, তবে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। একইভাবে কোনো নারীকে ধর্ষণের আগে বা পরে যদি তাকে হত্যা করা হয়, তবে হত্যাকারী ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। বেশির ভাগ ফকিহের মতে, এমন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড তরবারির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘কেউ তোমাদের সঙ্গে সীমা লঙ্ঘন করলে তোমরাও তার সঙ্গে অনুরূপ আচরণ করো।’ (সুরা: বাকারাহ, আয়াত : ১৯৪; তাফসিরে কুরতুবি : ২/৩৫৮)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেওয়া হয়েছে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৭৮)

ধর্ষণের শাস্তি প্রয়োগে কঠোর হওয়ার নির্দেশ

পবিত্র কুরআনের ব্যভিচার ও ধর্ষণের শাস্তি সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, ‘ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী—তাদের প্রত্যেককে এক শ কশাঘাত করবে। আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের প্রভাবিত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও; মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ২)

উল্লিখিত আয়াতে দুটি বাক্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: ক. আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের প্রভাবিত না করে, খ. মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। এই দুই বাক্য থেকে বোঝা যায় ধর্ষণ ও ব্যভিচারের শাস্তি প্রয়োগে কঠোর হতে হবে এবং তা জনসমক্ষে হওয়া আবশ্যক। যেন তা মানুষের অন্তরে ভয় সৃষ্টি করে এবং জনসাধারণ এমন অপরাধে লিপ্ত হতে ভয় পায়।

মুজাহিদ (রহ.) বলেন, শাসকের কাছে ব্যভিচারের অপরাধ পেশ করা হলে সে শাস্তি বাস্তবায়ন করবে। এ ক্ষেত্রে সে শিথিলতা বা নিষ্ক্রিয়তা দেখাবে না। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৮/২৯)

অপরাধ প্রমাণের পর শাস্তি

ব্যভিচার ও ধর্ষণের অপরাধ প্রমাণের পরই কেবল শরিয়ত বর্ণিত শাস্তি প্রয়োগ করা যাবে, নিছক সন্দেহ বা অভিযোগের ভিত্তিতে তা প্রয়োগ করা যাবে না। এই অপরাধ প্রমাণের পদ্ধতি হলো :

১. স্বীকারোক্তি : অপরাধী যখন স্বীকার করবে যে আমি এই অপরাধ করেছি। মহানবী (সা.) অপরাধীর স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তাকে শাস্তি দিয়েছেন। স্বীকারোক্তির ভিত্তিতেই গামেদি গোত্রীয় নারীর বিরুদ্ধে তিনি শাস্তির রায় দেন।

২. প্রমাণ : যখন চারজন ন্যায়পরায়ণ পুরুষ সাক্ষ্য দেবে যে তারা এই কাজ সংঘটিত হতে দেখেছে। চারজন সাক্ষীর বিষয়টি কোরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের স্ত্রীদের ভেতর কেউ যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তবে তোমরা তার বিরুদ্ধে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৫)

৩. আধুনিক প্রযুক্তি : অপরাধ প্রমাণে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়ার অবকাশ আছে। তবে প্রযুক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা যাবে না। কেননা প্রযুুক্তির বিভ্রাট প্রমাণিত। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সন্দেহ হলে তোমরা হদ প্রতিহত করো।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৪২৪)

ধর্ষণের শাস্তি হবে প্রকাশ্যে

ইসলামে ধর্ষণের কারণে মৃত্যু হলে, প্রথমে ধর্ষক ব্যভিচারের শাস্তি পাবে পরে হত্যার শাস্তি পাবে। ইসলামে ধর্ষণের শাস্তি কঠোর করে প্রদানের হুকুম দেওয়া হয়েছে। যা দেখে অন্য কেউ যাতে এ ধরনের কাজ করতে সাহস না পায়।

ইসলামে ধর্ষণ ও ব্যভিচারকারীকে সবার সামনে শাস্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে যাতে মানুষ এ শাস্তি স্বচক্ষে দেখতে পায় ও নিজে এমন গর্হিত কাজ করতে সাহস না পায়। প্রকাশ্য শাস্তি দেখলে মানুষের মধ্যে ভয় ঢুকবে এবং এ ধরনের জঘন্য কাজ থেকে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে হেফাজত করবে। এক্ষেত্রে পারিবারিক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব অনেক।

বর্তমান বাংলাদেশের চিত্র দেখলে বোঝা যাচ্ছে, ধর্ষণ এখন আর মানুষের শারীরিক গঠনের ওপর আকর্ষিত হয়ে ঘটছে এমনটা নয়। মানুষের নীতি নৈতিকতার এত অবনতি হয়েছে যে চার বছর, আট বছরের শিশুও এর থেকে রেহায় পাচ্ছে না।

জাহেলি যুগে নারীদের যেমন ভোগের বস্তু মনে করা হতো। বর্তমান চিত্র দেখলেও তেমনটাই অনুভব হচ্ছে। অথচ ইসলামে নারীদের রানির মতো রাখা হয়েছে। মা, বোন, স্ত্রী, কন্যা এদের সঙ্গে সৎ ব্যবহারের ফলে জান্নাত যাওয়ার মাধ্যম বলা হয়েছে তাদের।

ধর্ষণ মুক্ত আদর্শ সমাজ গড়তে জনসচেতনতার পাশাপাশি ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রচার প্রসার জরুরি। ইসলামি আইন বাস্তবায়নই ধর্ষণ প্রতিরোধের স্থায়ী সমাধান।

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Default Advertisement

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

MonTueWedThuFriSatSun
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031 

সম্পাদক (ডেমো)

এস এ ফারুক

যোগাযোগ

89/A (3rd floor), Anarkoli Super Market (behind the Mouchak market), 77/1 Shiddheswari Ln, Dhaka 1217

মোবাইল: 01915344418

ই-মেইল: faroque.computer@gmail.com

Design and Development by : webnewsdesign.com